বাংলাদেশে গণহত্যা-১৯৭১

বাংলাদেশে গণহত্যা-১৯৭১/ “মুক্তিরও মন্দিরও সোপানও তলে কতো প্রাণ হলো বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে।”

by Abul Khayer on Sunday, August 7, 2011 at 9:11am

“দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা…” অথবা “তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা আর কতকাল বইতে হবে খাণ্ডব দাহন…”! দাম দিতে হয়েছে বৈকি! অত্যন্ত চড়া দামের অর্জন স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। ৩০ লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু আর ২ লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এই মহতী অর্জন!  ২য় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জনে এতো মূল্য বোধকরি বাঙালী ভিন্ন  অন্য জাতিকে দিতে হয় নি। ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সারাদেশটাকে বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিল। ১৬ই ডিসেম্বরে দেশ হানাদার মুক্ত হলে দৈনিক পূর্বদেশ এবং সোভিয়েত দৈনিক প্রাভদা দেশব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞ নিরুপণে এক জরীপ অভিযান শুরু করে। দেশের সবগুলো জেলা, মহকুমা, থানা, ইউনিয়ন এবং গ্রাম পর্যায়ে সমীক্ষা চালিয়ে বধ্যভূমি চিহ্নিতকরণ এবং গণহত্যার শিকার অজানা শহীদদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়। জরীপ চলাকালেই এতদসংক্রান্ত তথ্য এবং অনুসন্ধানী রিপোর্ট দৈনিক পূর্বদেশসহ অন্যান্য প্রধান দৈনিক সমূহে বছরজুড়ে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। তথাপি মুক্তিযুদ্ধে অজানা শহীদদের সংখ্যাগত বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজাকার ও বাম রাজাকারদের কুতর্কমূলক লাগাতার প্রচারণায় অদ্যাবধি প্রজন্ম-পরম্পরায় এবিষয়ে বিভ্রান্তি জারী আছে। গণহত্যা আর বধ্যভূমি বিষয়ে নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সন্নিবেশিত হয়ে সাহিত্যমালা তৈরীর উদ্যোগ জরুরী। প্রিয় মাতৃভূমির মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে অংশগ্রহণকারী নাম না জানা শহীদদের আত্মদান বিষয়ে গবেষণার মহতী উদ্যোগ রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত হলেই কেবল তা সম্ভবপর হবে। ১৯৭২-এর ২রা মার্চে দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত গণহত্যা ও বধ্যভূমি বিষয়ক রিপোর্টের একটি খণ্ডিত চিত্র পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করছি।

ডেটলাইন পটুয়াখালী 

মোগো মাডি চাপা দিও না, মোরা অহনও মরি নাই 

“ভাইরা মোগো মাডি চাপা দিও না, মোরা অহনও মরি নাই।” “ওরা মরতে চায় নি এ সুন্দর ভুবনে। তাই বাঁচার জন্য শেষ আকুতি জানিয়েছিল কিষাণ-কামলা পেশার এ মানুষ জনেরা।” এভাবেই দৈনিক পূর্বদেশের প্রদায়ক এন. ইসলাম লিপিবদ্ধ করেছেন পটুয়াখালী জেলার প্রধান বধ্যভূমি জেলখানার কথা। “হানাদার নরপিশাচ বর্বর পাকবাহিনীর দালালেরা প্রত্যন্ত গ্রামগুলো থেকে ছাত্র-যুবক-নারী-পুরুষদের ধরে নিয়ে আসতো এবং তাদেরকে ইচ্ছেমত নির্যাতন করে কাল্পনিক কাহিনী সাজিয়ে বিবরণ লিখতে বাধ্য করতো। সে লোমহর্ষক অত্যাচার-নির্যাতনের ছিটেফোটা যা বাইরে আসতো তা গেস্টাপো বাহিনীর অত্যাচারকেও হার মানাতো। ধৃত লোকগুলোকে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। শঙ্কর মাছের লেজে তৈরী চাবুক দিয়ে পেটাতো। বুট দিয়ে লাথি দিতে থাকতো এবং বেয়োনেট দিয়ে খুচিয়ে শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে সিরিঞ্জ দিয়ে শরীরের রক্ত বের করে নিতো। এরপর ক্ষত-বিক্ষত স্থানে লবন-মরিচের গুড়ো মেখে দিতো। এমনকি দিনের পর দিন অত্যাচার করে পানি পর্যন্ত পান করতে দিতো না। এমনিভাবে নিরপরাধ নিরস্ত্র বাঙালীর উপর হার্মাদ পাকবাহিনীর জেলা কমান্ডার মেজর নাদের পারভেজ, ক্যাপ্টেন মুনীর স্বহস্তে এবং কারাভ্যন্তরে জল্লাদদের দ্বারা বীভৎস অত্যাচার চালাতো।” অপরাধ ছিল একটাই এই মানুষগুলো বাঙালী আর এরা জয় বাংলার লোক।

“এভাবে কয়েকদিন অতিবাহিত হলে জেলের ভেতরেই একটা বিচারের প্রহসন করতো। ধৃত লোকগুলোর মধ্য থেকে ২৫/৩০ জনকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করাতো এবং অত্যাচারের মুখে যে কথা স্বীকার করাতো তার ভিত্তিতেই একতরফা বিচার করতো এবং রায় দিতো এই বলে যে, ‘ইসকো দফা কার দো।’ তখন সকলকে একসারিতে দাঁড় করিয়ে উল্লাস আর মজা করতে করতে গুলী চালিয়ে হত্যা করতো। অনেক সময় আগেই দালাল বাহিনী এবং স্থানীয় অবাঙালীদের সহায়তায় জোর করে দিনমজুর তথা কামলা সংগ্রহ করে লম্বা গর্ত করে রাখতো। যাদের গুলী করা হতো তাদের গর্তগুলোর কাছে দাড় করানো হতো। যাতে মৃতদেহগুলো সহজেই গর্তে ফেলে মাটি চাপা দেওয়া যায়। গুলীর সাথে সাথেই বন্দীরা মাটিতে পড়ে কাতরাতে থাকতো। তখন মাটি চাপা দেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তরা এগিয়ে আসলে মৃত্যুপথ যাত্রী এসব নিরীহজন আর্তনাদ করে কাতর মিনতি সহকারে বলতো, ‘ভাইরা মোরা অহনও মরি নাই, মরার আগে মোগো মাডি চাপা দিও না।’” প্রদায়ক জনাব এন. ইসলাম এসব হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আরও বলছেন, “কথাগুলো শুনছিলাম এককালীন সুপরিচিত রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিক জনাক আবুল হাশেমের কাছ থেকে। তিনি দালালদের বদৌলতে গলাচিপায় ধৃত হয়ে পটুয়াখালী জেলখানায় দেড়মাসকাল হানাদার বাহিনীর অত্যাচার ভোগ করেছেন এবং মুক্ত হয়ে বাইরে আসলে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ সংবাদদাতাকে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে উপরোক্ত কথাগুলো ব্যক্ত করেন। তিনি আরও বলেন যে, তাঁকে ওরা গুলী করার জন্য তিন তিনবার লাইনে দাঁড় করিয়েছিল কিন্তু স্রেফ ভাগ্যগুণে তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন। অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ৬০ বছর বয়স্ক পঙ্গু কৃষক ও রাজনৈতিক নেতা শ্রী হীরালাল দাশগুপ্ত (সবার হিরোদা)-কেও রেহাই দেয় নি। ২৭শে এপ্রিল তাঁর বাসা থেকে নরপিশাচরা তাঁকে ধরে নিয়ে যায় এবং কয়েকদিন অত্যাচারের পর মেরে ফেলে।” জনাব এন. ইসলাম আরও লিখছেন, “সম্প্রতি জেলা প্রশাসক মিঃ বি বি বিশ্বাসসহ সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে পটুয়াখালীর অন্যতম বধ্যভূমি জেলখানার কয়েকটি গর্ত খনন করে হাজার হাজার নরকঙ্কাল পাওয়া যায়। অন্যান্য আলামতের ভিতর পুলিশের বেল্টের দুটি চাকতি- (পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ খোদিত) পাওয়া গেছে। জেলখানায় আটক জীবিত লোকদের কথামত বিভিন্ন জায়গায় ঘুড়ে রক্ত-মগজ দেয়ালে দেয়ালে দেখতে পাওয়া যায়। হানাদারগুলো পাকিস্তান ও ইসলামের নামে নিরীহ লোকগুলোকে মেরে একই গর্তে পুঁতে রাখতো। পটুয়াখালীর অন্যতম বধ্যভূমি জেলখানায় ওরা ২৬শে এপ্রিল থেকে ৯ই ডিসেম্বর (পটুয়াখালী মুক্ত হওয়ার দিন) পর্যন্ত প্রতিদিন ২৫-৩০ জন লোক মেরেছে। প্রথম দিকে ওরা গুলী করে মারতো। কিন্তু গুলীর শব্দ হলে লোক শহরে আসে না বলে ওরা পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারতো অথবা জবাই করতো। এমন কি ঈদের দিনও বাদ যায় নি। নদীমাতৃক পটুয়াখালী জেলার সব জায়গাই বলতে গেলে বধ্যভূমি। তার মধ্যে পটুয়াখালী শহরের সিএনবি নিকটস্থ নদীর পার, বরগুনার জেলা, থানা, বরগুনার ওয়াপদা, পাথরঘাটা, খেপুপাড়া, মদনপুরা, চিকনীকান্দি, গলাচিপা, বামনা, মুজাগঞ্জ, বেতাগী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।” উপরোক্ত রিপোর্টে পটুয়াখালী জেলার একটি প্রধান বধ্যভূমি জেলা কারাগার সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য যা পাওয়া যায়, তাতে ২৬শে এপ্রিল থেকে ৯ই ডিসেম্বর মোট ২২৭ দিনে প্রতিদিন গড়ে সর্বনিম্ন ২৫ জন করে হত্যা করলে দাড়ায় ৫,৬৭৫ জন। প্রদত্ত রিপোর্টে এরকম আরও ১২টি বধ্যভূমির কথা বলা হচ্ছে। নৃশংস কায়দায় বাঙালী নিধনযজ্ঞে পাকিস্তান বাহিনী চালিত হয়েছিল ইসলামের নামে। পবিত্র ধর্মের অপব্যাখ্যা করে বাঙালী মাত্রেই অমুসলমান এবং কাফের। সুতরাং হত্যা, কাফের হত্যাই একমাত্র পুণ্যের কাজ। পটুয়াখালীর জেলা কারাগারের মতো সহস্র বধ্যভূমি গড়ে উঠেছিল দেশের আনাচে-কানাচে। কত নিষ্ঠুরপন্থায় মানুষ হত্যা করা যায় তার কৌশল উদ্ভাবনে বধ্যভূমিগুলো হয়ে উঠেছিল পাকবাহিনীর জন্য এক একটি পরীক্ষাগার। আর স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র বাঙালীর জন্য বিভীষিকাময় মৃত্যুপুরী। পুরোনো পত্রিকায় লিপিবদ্ধ এসকল শত শত রিপোর্ট পড়তে পড়তে চোখ ভিজে আসে। কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে পড়ে। কেবলই মনে হয় “মুক্তিরও মন্দিরও সোপানও তলে কতো প্রাণ হলো বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে।” পরবর্তীতে এবিষয়ে তৎকালীন পত্রিকা থেকে আহরিত তথ্য-উপাত্ত ও রিপোর্ট সমূহ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের আকাঙ্ক্ষায় ইতি টানছি।

পটুয়াখালী জেলা কারাগার

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Advocate Nazma Kawsar

A Blog of Advocate Nazma Kawsar

মুক্তির বার্তা ২৪

মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার স্বপক্ষশক্তির একটি পত্রিকা

Mousumi akther mou

Graphics Degin

হারিয়ে গিয়েছি মা

A blog of Freedom Fighter Mukthi

Whom Shall We Trust?

A Blog of freedom fighter Moktel Hossain Mukthi

আমি যুদ্ধ দেখেছি

মোকতেল হোসেন মুক্তি

Moktel Hossain Mukthi

A blog of Freedom Fighter Mukthi

Bangladesh in 1971

A blog of Freedom Fighter Mukthi

Eliza Haya Ijaz's Photo

A blog of Moktel Hossain Mukthi

Islam Ebong Shanti

Rediscovering Islam's Message of Peace & Love

Moktel Hossain Mukthi

A blog of Muktimusician

মুক্তিরকাজ MukthizCreation

A blog of Moktel Hossain Mukthi

জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু

মোকতেল হোসেন মুক্তির একটি ব্লগ

MukthizCreation মুক্তিরকাজ

A blog of Moktel Hossain Mukthi

Father of Bengali Nation

A blog of Moktel Hossain Mukthi